আজ হৃদয় ফাটা আর্তনাদে ভাসবে মক্কা নগরী

রেডিও ১৬ আনা- 

সৌদি আরবে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা আজ বৃহস্পতিবার পবিত্র হজ পালন করবেন। খোদার ঘরের মেহমানরা আজ আরাফার প্রান্তরে অনুভব করবেন রাব্বুল আলামিনের সেই মায়াভরা বাণী। যেখানে মধুর সুরে তিনি বলছেন- ‘নাহনু আকরাবু ইলাইহি মিন হাবলিল ওয়ারিদ। (কাফ, আয়াত-১৬)। অর্থ- হে আমার প্রিয় বান্দা, আমি তো
মার শাহরগের কাছে থাকি। তাই তো আজ দিনভর আরাফার ময়দানে রাব্বুল আলামিনের অনুভব, অনুভূতির শিহরণ হবে প্রেমিক মনে।

জীবনের আপদমস্তক গোনার দৃশ্য স্মরণ করে হৃদয়ভাঙা আহাজারি করবেন তারা, ক্ষমা করুন, করুণা ধারা বর্ষণ করুন, হে রাব্বুল আলামিন দৃশ্য অদৃশ্য জগতের মালিক। হৃদয় ফাটা আর্তনাদে মরুর বুক ভেসে যাবে কান্নায়। আর তখনই বান্দার শাহরগে মিশে থাকা আল্লাহর সুর ধনি,- লাব্বাইক আল্লাহুমা লাব্বাইক, আমি হাজির, আমি হাজির, বেজে উঠবে। আত্মা আর পরমাত্মার সুরে সিজদাবনত হবে আরাফাবাসী। অর্থাৎ আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার। এই ধ্বনিতে বৃহস্পতিবার মুখর হবে আরাফাতের ময়দান। আরাফাতের ময়দানে জোহরের নামাজ শেষে খুতবায় অংশ নেন মুসল্লিরা। এরপর তাঁরা আসরের নামাজ আদায় করবেন। 

সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করবেন। রাতে সেখানে খোলা মাঠে অবস্থান করবেন। শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করবেন সেখান থেকে। পবিত্র হজ পালনে মুসল্লিরা মঙ্গলবার রাত থেকে মিনায় পৌঁছাতে শুরু করেন। বুধবার সারাদিন তারা মিনায় অবস্থান করেন। 

বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজ আদায় করে তারা রওনা হবেন আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে। আরাফাতের ময়দানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানে সারাদিন হাজিরা আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকবেন। সাদা ইহরাম বাঁধা অবস্থায় লাখ লাখ হাজির পদচারণায় আরাফাতের ময়দান পরিণত হবে এক শুভ্রতার সমুদ্রে। হজের খুতবা শুনবেন এবং এক আজানে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করবেন মুসল্লিরা। সন্ধ্যায় তারা মুজদালিফার উদ্দেশে আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করবেন। মুজদালিফায় পৌঁছে আবারও এক আজানে আদায় করবেন মাগরিব ও এশার নামাজ। সেখান থেকে জামারায় (প্রতীকী শয়তান) নিক্ষেপের জন্য কঙ্কর (ছোট পাথর) সংগ্রহ করবেন। মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করবেন তারা। ১০ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর জামারায় পাথর নিক্ষেপের জন্য রওনা দেবেন মুসল্লিরা। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে যাওয়ার আগে জামারাতুল আকাবায় (বড় শয়তান) ৭টি পাথর নিক্ষেপ করা হবে। 

জামারাতুল আকাবায় পাথর নিক্ষেপের পর আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তারা পশু কোরবানি করবেন। এরপর মাথা মুণ্ডন করে এহরাম খুলে অন্য পোশাক পরবেন। একে তাহালুলে আসগর বলা হয়। তারপর তাওয়াফে ইফাদা (কাবাঘর তাওয়াফ) এবং সায়ি (সাফা-মারওয়ায় সাত চক্কর) শেষ করে ফের মিনায় ফিরে যাবেন। ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে সূর্য হেলে পড়ার পর প্রতিদিন ছোট, মধ্য ও বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করবেন হাজিরা। যারা ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করতে পারবেন না, তারা ১৩ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করবেন এবং জামারায় ১১ ও ১২ তারিখের মতো পাথর নিক্ষেপ করবেন। হজ অর্থ সংকল্প করা, দর্শন করা। 

রাব্বুল আলামিনের প্রেমের অনন্য নিদর্শন এই হজ। কাবা শরিফের তাওয়াফ, মদিনা শরিফের জিয়ারত, মুজদালিফা, মুলতাজাম, হাজরে আসওয়াদ, জমজম, মাকামে ইবরাহিমের সায়ী, উকুফে আরাফা, জামারাত কোরবানি, বিদায়ী তওয়াফ’ এগুলো মুমিনের জন্য রাব্বুল আলামিনের সান্নিধ্যস্থল। মুমিনের হৃদয়ে যখন রাব্বুল আলামিনের ইশক ও মুহাব্বতের বর্ষণ শুরু হয় তখন থেকে হজের জন্য কাতর হতে থাকে তার আত্মা বা রূহ। হজ মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর চেতনা ও আদর্শের প্রতীক। হজের প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে আল্লাহর একত্ববাদ, একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সমৃদ্ধ স্বীকৃতি। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনজুড়ে ছিল কঠিন সব পরীক্ষা। সেসব পরীক্ষা ছিল দুনিয়ার বিচারে অবাস্তব অকল্পনীয়, বিবেকের কাছে যা অগ্রহণীয়। 

সব পরীক্ষাই তাকে দিতে হয়েছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এলো- যেখানে কোনো গাছপালা, ফল-শস্য, পানি বা লোকজনের বসতি নেই স্ত্রী সন্তান সেখানে রেখে আসার। এমন পরীক্ষাতেও হজরত ইবরাহিম (আ.) উত্তীর্ণ হলেন। উপাধি পেলেন খলিলুল্লাহ- আল্লাহর বন্ধু নামের প্রেমময় ভূষণ। সেই জনমানবহীন ভূমিই আজ বিশ্ব মুসলিমের তীর্থস্থান। সেখানেই সমাধা করতে হয় হজের যাবতীয় ব্রত। পরের পরীক্ষা আরও কঠিন। পিতা পুত্রকে জবাই করতে হবে, এটা আল্লাহর আদেশ। এ কাজেও হজরত ইবরাহিম (আ.) স্বতঃস্ফূর্ত রাজি হয়ে গেলেন। 

আল্লাহ প্রেমিক কাকে বলে! প্রেমের দৃষ্টান্ত রাখলেন পিতা-পুত্র। পুত্রও পিতার হাতে জবাই হতে রাজি হয়ে গেলেন। কোরআনের ভাষায়, হে পিতা আপনি বাস্তবায়ন করুন যা আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ইনশাল্লাহ আপনি আমাকে পাবেন ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা সাফফাত ১০২)। আল্লাহ ডেকে বললেন- হে ইবরাহিম তুমি বাস্তবায়ন করেছ তোমার স্বপ্নাদেশ। (তুমি সফল ও সার্থক হয়েছে)। মাওলার প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা। ওই প্রেম ও ভালোবাসার আলোকচ্ছটায় যার আত্মা উদ্ভাসিত হয় সেই তো কাবার প্রেমে ব্যাকুল হয়ে কালো গিলাফ দর্শনে আকুল হয়ে হজব্রতে ছুটে আসেন। হজের অন্যতম বিশেষ ইবাদত হল আল্লাহর জন্য পশু কোরবানি করা। আমরা কোরবানি বা পশু জবাই করি, পশুত্বকে জবাই করি না। আল্লাহ বলেন, কোরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত কখনই আল্লাহর কাছে পৌঁছবে না, পৌঁছবে শুধু তোমাদের কলবের তাকওয়া (সূরা হজ, আয়াত ৩৭)। এটিই কোরবানির শিক্ষা। 

হযরত ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.) যখন আল্লাহর আদেশের সামনে কোরবান হয়ে গেলেন এবং পিতা ইবরাহিম পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর গলায় ধারালো ছুরি চালালেন তখনই আল্লাহ বললেন ‘(থামো) হে ইবরাহিম! স্বপ্নকে তো তুমি সত্য করে দেখালে। (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১০৫) এবং কোরবানি করার জন্য আল্লাহ জান্নাত থেকে দুম্বা পাঠালেন। আর বললেন, ‘এভাবেই আমি মুহসিনিনদের পুরস্কৃত করি’ (সূরা আল-সাফফাত, আয়াত ১০৫)। হাজীরা তো কোরবানি করবেনই, এর বাইরে যার ওপর জাকাত ফরজ তার ওপর কোরবানি দেয়া অপরিহার্য করেছে ইসলাম। আমরা আজ সুন্দর সুন্দর পশু কোরবানি করি, কিন্তু আল্লাহর কাছে যা পৌঁছবে, তা সুন্দর করার চিন্তা করি না। পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃত্তি নামক অদৃশ্য পশুটির গলায় ছুরি চালাতে হবে আমাদের। তা হলেই আমরা হতে পারব প্রকৃত মাওলার প্রেমিক। আমরা তখন পাব মাওলার সান্নিধ্য। হজের আনুষ্ঠানিকতা শুধু দৈহিক বা আর্থিক পরিপালনের বিষয় নয়। 

রূহের হেরার ঘরে বাতি জ্বালানোর মোক্ষম এক ইবাদত। আত্মার ঘরকে ভালোবাসার রঙে রাঙানোর পর্ব এটি। তাই হজের দিনটি সতর্কতার সঙ্গে মজনু বেশে যাপন করা জরুরি। প্রসঙ্গত, পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রতি বছরের মতো এ বছরও হজ পালনে এবার বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ২০ লাখের বেশি মুসল্লি সমবেত হয়েছেন। এর মধ্যে এ বছর বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ২৭ হাজারের বেশি মুসলমান হজব্রত পালন করছেন। হজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সৌদি আরব সরকার। নিয়োগ করা হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার নিরাপত্তাকর্মী।

Comments